চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাস (জুলাই-এপ্রিল) শেষ হয়েছে। ১১তম মাস মেও শেষের পথে। প্রথম নয় মাসের মতো দশম মাস এপ্রিলেও রাজস্ব আহরণে পিছিয়ে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আর চলতি মে মাস শেষে আহরণ পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন এনবিআর বিলুপ্ত করে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিলের দাবিতে চলমান আন্দোলনে স্থবির হয়ে পড়েছে এনবিআরের কার্যক্রম।
এনবিআরকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সংশোধিত রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়। এর মধ্যে এপ্রিল পর্যন্ত ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৭৩২ কোটি ৯১ লাখ টাকার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু এপ্রিল পর্যন্ত এনবিআর রাজস্ব আহরণ করতে পেরেছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৫৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম আহরণ হয়েছে ৭১ হাজার ৪৭৬ কোটি ৭ লাখ টাকা। আর অর্থবছরের মোট সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম আহরণ হয়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আহরণ ৩৮ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চলতি মাস ও জুনে রাজস্ব আহরণ করতে হবে ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
এর মধ্যে একক খাত হিসেবে আয়কর ও ভ্রমণ কর আহরণে মোট সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে এনবিআর। এ খাতে ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে। এপ্রিল পর্যন্ত ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৮০ কোটি ৫ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৯৪ হাজার ৯৩৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকা আহরণ করতে পেরেছে এনবিআর।
স্থানীয় পর্যায়ে মূসক আহরণে মোট সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৫ দশমিক ১৬ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে এনবিআর। এ খাতে ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে। এপ্রিল পর্যন্ত ১ লাখ ২৯ হাজার ৪২২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১ লাখ ১১ হাজার ২০২ কোটি টাকা আহরণ করতে পেরেছে এনবিআর।
আমদানি ও রফতানি পর্যায়ে রাজস্ব আহরণেও বড় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এ খাতে মোট সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩২ দশমিক ৬৯ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে এনবিআর। এ খাতে ১ লাখ ২০ হাজার ৫১০ কোটি টাকার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে। এপ্রিল পর্যন্ত ১ লাখ ১ হাজার ৬৩০ কোটি ৪৭ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৮১ হাজার ১১৬ কোটি টাকা আহরণ করতে পেরেছে এনবিআর।
চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার ৮০ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। আগের অর্থবছরের তুলনায় যা কিছুটা বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে আহরণ হয়েছিল ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৪২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। সে হিসেবে এ অর্থবছরের ১০ মাসে আহরণের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ।
একক মাস হিসেবে শুধু এপ্রিলে রাজস্ব আহরণের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬ হাজার ৫৮০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। আহরণ হয়েছে ৩০ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম আহরণ হয়েছে বা ঘাটতি রয়েছে ৫ হাজার ৮১০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। গত অর্থবছরে এ মাসে আহরণ হয়েছিল ২৮ হাজার ৬৫০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। সে হিসাবে আহরণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। আর এপ্রিলের আহরণ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পিছিয়ে আছে ১৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
পরিস্থিতি নিয়ে এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজস্ব আহরণে বড় ব্যাঘাত ঘটছে। সাধারণত অর্থবছরের শেষ দুই মাস (মে-জুন) রাজস্ব আহরণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। আগামী ২ জুন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণা করা হবে। এমন সময়ে কলমবিরতি শেষে এনবিআরের কর অঞ্চল, ভ্যাট কমিশনারেট ও কাস্টমস হাউজগুলোয় এখন চলছে পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি। এনবিআর বিলুপ্ত করে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিলের দাবিতে গত ১৪ মে থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন এখনো চলমান রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত ১০ মাসের রাজস্ব আহরণের হিসাব দেখে বোঝা যাচ্ছে, এনবিআর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবে না। সেজন্য উন্নয়ন বাজেট কাটছাঁট করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে সরকারকে ব্যাপক ধার করতে হবে। সেজন্য সুদও দিতে হবে। এবারের বাজেটের একটা অংশ ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হয়ে যাবে। এনবিআরে চলমান আন্দোলনকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমাধানে সরকারের এগিয়ে আসা দরকার। নয়তো চলতি মাসে বড় ধাক্কা আসবে রাজস্ব আহরণে।’
এনবিআরের কাস্টমস বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কাস্টমস খাতে গড়ে প্রতি কর্মদিবসে ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকার রাজস্ব আয় হয়। অর্থবছরের শেষ দুই মাসে এর পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। আন্দোলনের কারণে এ রাজস্ব আহরণে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে বলে কাস্টমস বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। একইভাবে ভ্যাট ও আয়কর খাতেও রাজস্ব আহরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে বরাবরই খুব চ্যালেঞ্জিং টার্গেট দেয়া হয়। এ লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন, বিশেষ করে নানাবিধ কারণে যখন অর্থনৈতিক কার্যক্রম কিছুটা ধীর হয়েছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও বিগত বছরের তুলনায় রাজস্ব আদায় বেড়েছে, এটা একটা ভালো দিক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এটা একটা ভালো অর্জন। তাছাড়া কর আদায় কার্যক্রম পুরোপুরি ডিজিটাল করা গেলে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো সম্ভব হবে।’